২৮৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম; করোনা ভাইরাসের কারণে পুরীর রথযাত্রা আপাতত স্থগিত তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩রা মে’ র পরেই

২৮৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম; করোনা ভাইরাসের কারণে পুরীর রথযাত্রা আপাতত স্থগিত তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩রা মে’ র পরেই

বাঙালি মানেই উৎসবের মেজাজ। সারাবছরই কিছু না কিছু উৎসব অনুষ্ঠানে আমরা নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখি।

গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহে ক্লান্ত জর্জরিত হওয়ার পর আষাঢ় মাসে বর্ষা শুরু হওয়ার মুহূর্তে আমরা নতুন উৎসব রথযাত্রার অপেক্ষা করি।

আর রথযাত্রা  শুনলেই আমাদের মনে হয় পুরীর শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা২৮৪ বছরের এই ঐতিহ্য চলে আসছে সেই রাজ রাজাদের এর সময় থেকেই । 

কিন্তু এ বছর ই এই ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটতে চলেছে , হয়তো নতুন এক অধ্যায় এর সাক্ষী থাকতে চলেছি আমরা।

এই প্রথম করোনা ভাইরাসের কারণে পুরীর রথযাত্রা আপাতত স্থগিত, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩রা মে’ র পরেই জানা যাবে ।

এই ১৪২৭ নতুন বছর প্রথম দিন থেকে কিছু নতুন অযাচিত জিনিসই উপহার দিচ্ছে যা আমাদের স্বপ্নেরও অতীত। তার কারণ অবশ্যই করোনা ভাইরাস।

বহু মানুষ এর কবলে পরার পরেও আমরা এই রোষ থেকে এখনো বেরোতে পারিনি। এতো বছরের ইতিহাস এই কারণেই এখন পতনের মুখে।

ওড়িশা সরকার এবং বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল মিডিয়া সেরকম ই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকেই যে উৎসবের শুভ সূচনা হয়ে যায় এখনো তার  কোনো লক্ষণ চোখে পড়ছে না। 

২৮৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম; করোনা ভাইরাসের কারণে পুরীর রথযাত্রা আপাতত স্থগিত তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩রা মে’ র পরেই
সৌজন্যে – google.com

কম বেশি এই বিশেষ দিনটির কথা আমাদের সকলেরই জানা এখন দেখে নি অজানা কিছু তথ্য 

♠ বছরের এই একটি দিনেই সুদর্শন চক্র সহ টি সুসজ্জিত রথে করে মন্দির থেকে জগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রা কে মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়।

♠ কয়েক লক্ষ মানুষ প্রভু শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার দর্শণের আশায়, এই রথের দড়ি টানার জন্যে এখানে উপস্হিত হন।  এই দিনেই ভিনদেশি এবং অন্যান্য সম্প্রদায় এর মানুষদের দেবদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়।

♠ জাতি, বর্ণ, ধর্ম ছাড়াও উচ্চ, নীচ,  নারী পুরুষ  নির্বিশেষে সকলেরই এই উৎসবে মিলিত ভাবে অংশ গ্রহণ করাই এই উৎসবের প্রধান লক্ষ্য।

♠ শৈশব থেকেই এই দিনটাকে ঘিরে আমাদের প্রচুর স্মৃতি। ওড়িশা, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ সহ পূর্ব ভারতের বেশ কিছু  রাজ্য এই দিনটায় নিজেদের সভ্যতা সংস্কৃতি অনুসারে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন। 

♠ প্রচুর জায়গায় মহা সমারোহে পুজোর পাশাপাশি মেলারও আয়োজন করা হয়। ছোট বড়ো সকলেই তাতে ভাগ বসান। আনন্দ করার সুযোগ পেলে তো তাতে সবারই উপস্থিতি আমাদের কাম্য।

এবার আসি পুরী ধামের মহাপ্রভু শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের মাহাত্ম ইতিহাস সম্পর্কে।  

সত্য যুগ থেকে চলে আসা ওডিশার এই রথযাত্রা মালবদেশের (তখন ওডিশা এই নামেই প্রচলিত ছিল) অবন্তীনগরের এক সূর্যবংশীয় বলিষ্ঠ এবং পরম বিষ্ণুভক্ত রাজার হাত ধরেই শুরু হয়। 

ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এই রাজা বিষ্ণুর স্বপ্নাদেশ পেয়েই এই জগন্নাথ রুপী মূর্তির জন্যে মন্দিরের শুভ সূচনা করেন এবং রথযাত্রা চালু করেন। 

সেই সময় থেকে এই পরিবারের যিনি রাজা উপাধি পান তিনি জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রার রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি দেন, স্বর্ণ ঝাড়ু দিয়ে নিজের হাতে মন্দির প্রাঙ্গন পরিষ্কার করেন, রথ গুলি ধুয়ে পরিষ্কার করেন  তারপর সুসজ্জিত রথের দড়িতে টান পরে।

আরম্ভ হয় রথযাত্রা। 

তবে রথ সাজানোর পদ্ধতি তেও আছে বেশ কিছু চমক।  জানতে হলে তো শেষ পর্যন্ত পড়তেই হবে।  

♠ সবার প্রথমে যে রথ থাকে তা হলো বলভদ্রের রথ। যাকে গুরুর প্রতীক হিসাবেই ধরা হয়।

♠ এরপর থাকে দেবী সুভদ্রার রথ যাকে ভক্তির প্রতীক হিসাবে মানা হয়। 

♠ আর সব শেষে থাকেন জগন্নাথ দেব স্বয়ং যাকে ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে সবাই মানে।

♠ আবার আরেক মতে জগন্নাথ দেবকে ব্রম্ভার প্রতীক, বলভদ্রকে জীব জগতের এবং দেবী সুভদ্রা কে শক্তির প্রতীক হিসাবেও মানা হয়।

হিন্দু ধর্মে জগন্নাথকে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের এক অবতার হিসাবে মনে করা হয়। দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রা কে নিয়েই তাঁর নিজের বাড়ি থেকে মাসির বাড়ি গমন।

ভক্তদের ভালোবাসায় বশবর্তী হয়েই এই দিনে ভগবান রাজপথে বেরিয়ে এসে সমস্ত ভক্তকুল কে দর্শন দেন।

জগতের নাথ’ বা ‘জগদীশ্বর’ জগন্নাথ স্বয়ং এই দিনে সকলকে আশীর্বাদ করেন তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করেন।

২৮৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম; করোনা ভাইরাসের কারণে পুরীর রথযাত্রা আপাতত স্থগিত তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩রা মে’ র পরেই
সৌজন্যে – google.com

মন্দির ও রথ সম্পর্কে অজানা ও ইন্টারেষ্টিং কিছু তথ্য

♠ এই মন্দির তৈরী হয় ২০৬ টি কাঠ দিয়ে। সংখ্যাটা কেমন মানবদেহের হাড়ের সঙ্গে মিল না? হ্যাঁ এটাই বিশ্বাস করা হয় মানবদেহেই ঈশ্বরের বাস। তাই মন্দির তৈরী করার জন্যে মানুষের হাড় এর মিল থাকবে না তাই কখনো হয়? 

♠ আমরা একটা কথা শুনে থাকি রথের দিন বৃষ্টি হবে না? বড়োই অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্য যে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো বছর যায়নি পুরীতে রথযাত্রার এই বিশেষ দিনে বৃষ্টি হয়নি। বর্ষার সময় হলেও একই দিনে বৃষ্টি হওয়াটা সত্যি অবাক কান্ড না?

♠ প্রতি বছরই নতুন করে রথ নির্মাণ করা হয় আর এই কাঠ জোগাড় করা হয় পুরীর পাশের জঙ্গল রানারপুর ও দাসপাল্লা  থেকেই।  

♠ তবে যে পরিমান গাছ কাটা হয় তার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ রেখেই তার দ্বিগুন পরিমান গাছ প্রতিবছর রোপন করা হয়। আর কারা এই রথ নির্মাণে যুক্ত থাকে জানেন? 

♠ প্রায় ১৪০০ কর্মী আদি কাল থেকে বংশ পরম্পরায় এই রথ নির্মাণ করে থাকেন। কাওকেই নতুন করে নির্বাচিত করা হয় না। এটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

♠ রথ তিনটিতে প্রায় ২০৮ কেজির মতো সোনা থাকে যে রথগুলি সম্পূর্ণভাবে তৈরী হয় কোনোরকম আধুনিক প্রযুক্তি ও সাজসরঞ্জাম ছাড়াই।

♠ তবে একসাথে তিনটি রথ তৈরী করা হয় না।  একটি রথ নির্মাণকাজ  শেষ হলে আরেকটি শুরু করা হয় এমনি তাৎপর্য ময় পুরীর এই রথযাত্রা।

♠ সম্পূর্ণ হাতে তৈরি এই রথে কোনো ফিতে, নাটবল্টু, ধাতু, পেরেক কিংবা গজের সাহায্য একদমই নেওয়া হয় না।  এমনকি কাঠের মাপও হাতের সাহায্যেই তৈরী করা হয়।  

♠ নন্দীঘোষা নাম জগন্নাথ দেবের রথটিতে তার সঙ্গী হলেন মদনমোহন।  ৪৪ ফুট ২ ইঞ্চির রথ টিতে প্রায় ৮৩২ টি কাঠের টুকরো ব্যবহৃত হয়।  রথের সারথির নাম দারুকা এবং ৪ টি ঘোড়ার  সাথে তা টানা হয়।   

♠ রথের দড়ি ধরতে পারলে পুন্য অর্জন করা যায় এই বিশ্বাসেই প্রায় ১৫ লাখ মানুষ হাজির হন দূর দূরান্ত থেকে।  তবে কেউ অসুস্থ হলে প্রায় ৯০০০ পুলিশ, ১০০০ স্বেচ্ছা সেবক এবং ২০০ জন ডাক্তার সেখানে সদা নিযুক্ত থাকেন।

♠ তার সাথে অস্থায়ী ছাওনি, জরুরি ভিত্তিক সেবা যাতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পেতে পারে তার ও আয়োজন করা হয়।  

♠ একসাথে এক লক্ষ মানুষের খাবার তৈরী করা রান্নাঘরে প্রতিদিন প্রস্তুত করা খাবার কোনোদিন নষ্ট হয় না বলেই ভক্তরা মনে করেন। এই রান্নাঘরের এতটাই মাহাত্ম। 

করোনা ভাইরাস ভার্সেস বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বন

ইংরাজী নতুন বছরের শুরু থেকেই কোরোনার কুপ্রভাব আমাদের উপর সব দিক থেকেই প্রভাব ফেলেছে। 

স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত তো হয়েইছে তার সাথে দিনের পর দিন মানুষের অসহায়তা বেড়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে উৎসবের আয়োজন করার অর্থ নিজেদেরই বিপদ নিজেরাই ডেকে আনা।প্রশাসন যথেষ্ট হেল্প করা সত্ত্বেও আমরা দিশাহীন।

শুধু বাড়িতে বসে সুদিনের অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। 

বাংলা নববর্ষ , দোলযাত্রা, অক্ষয় তৃতীয়াঅনুষ্ঠান সহ সব রকম পার্বনই এ বছরের ইতিহাস থেকে বাদ পড়েছে।

ফল স্বরূপ এই প্রথম বছর হয়তো আমরা এই বিশেষ মাধুর্যময় দিন টির আসল আকর্ষণ টাকেই হারিয়ে ফেলতে চলেছি।

পশ্চিমবঙ্গেও রথযাত্রার আয়োজনকারী স্থানগুলিকে কড়া নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে কোনো জাঁকজমক অনুষ্ঠানের আয়োজন না করতে।

পুরীতেও সেই রকমই পুজোর আয়োজন করা হলেও মন্দিরের বাইরে কোনো রথ বের করা হবে না বলেই  মন্দির সূত্রের খবর।

এক মাস যাবৎ লকডাউন চলার পরেও কবে আমরা এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন দিনের মুখ দেখবো সেই অপেক্ষাতেই রত।

তবে রথযাত্রার সময় এই লকডাউন কেটে গেলেও রথ তৈরী এবং রথযাত্রার বিধিনিষেধ মন্দিরের গন্ডি অতিক্রম করবে না এই  কঠিন সত্যটাই হয়তো বাস্তব হতে চলেছে।

সবাই সুস্থ থাকবেন। সবাইকে রথযাত্রার শুভ কামনা।

কলমে – DCW Staff