অক্ষয় তৃতীয়ার মহাত্ম্য ও পুণ্য অর্জনের উপায়

অক্ষয় তৃতীয়ার মহাত্ম্য ও পুণ্য অর্জনের উপায়

বাঙালীর অক্ষয় তৃতীয়া

   সংস্কৃত শব্দ অক্ষয়– এর অর্থ হলো সমৃদ্ধি, সাফল্য, চিরস্থায়ী। তাই এমন শুভকর্ম যার সুফল আমরা আজীবনকাল ধরে ভোগ করে যেতে চাই, তার মনস্কামনার উদ্দেশ্যে অক্ষয় তৃতীয়ার উজ্জাপন হয়। 

কারণ আমাদের বিশ্বাস এই দিনটিতে হওয়া কোনো কাজ বা প্রাপ্তি “অক্ষয়“-রত অবস্থায় চিরকাল আমাদের জীবনে স্থায়ী হয়ে থাকবে।

অক্ষয় তৃতীয়ার পৌরাণিক গুরুত্ব:

  হিন্দু ও জৈন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের জন্য অক্ষয় তৃতীয়া এক বিশেষ তাৎপর্যপুর্ণ তিথি। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিটির পৌরাণিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্ব অপরিসীম। 

কথিত আছে:

  ❤ এই শুভদিনে জন্ম নিয়েছিলেন বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম। 

❤ বেদব্যাস ও গণেশ এই দিনে মহাভারত রচনা আরম্ভ করেন। 

❤ এদিনই সত্য যুগের আরম্ভ হয় ও সত্য যুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনাও হয় অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ লগ্নে। 

❤ এদিনই রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন। তাই হিন্দুরা গঙ্গার জলকে পবিত্র অক্ষয় বলে গণ্য করে।

❤ অক্ষয় তৃতীয়াতেই কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন। এদিনই কুবেরের লক্ষ্মী লাভ হয়েছিল বলে বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।

❤ এইদিন থেকেই পুরীধামের জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার উপলক্ষ্যে রথ নির্মাণ প্রারম্ভ হয়।

❤ কেদার-বদ্রি-গঙ্গোত্রী-যমুনত্রী যা হিন্দুদের কাছে মহা পবিত্র চারধাম মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের দ্বার ছয় মাস বন্ধ রাখার পর এই দিনেই তা উন্মুক্ত করা হয়, এবং দেখা যায় ছয় মাস পূর্বে যে প্রদীপটি জ্বালিয়ে আসা হয় তা তখনও উজ্জ্বল থাকে।

❤ দেবী অন্নপূর্ণার আবির্ভাব ঘটে অক্ষয় তৃতীয়ার শুভলগ্নে।

❤ কৌরব রাজসভায় রথী-মহারথীদের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের চেষ্টা করেছিলেন দুঃশাসন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের করুণায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। পাঞ্চালীর লজ্জা নিবারণ করেছিলেন বাসুদেব। দিনটি ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।

❤ সুদামা তাঁর বাল্য সখা শ্রী কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে এদিনই সুদূর বৃন্দাবন থেকে দ্বারকায় এসেছিলেন।

অক্ষয় তৃতীয়ায় দানের পুণ্যফলের লাভ:

   আমরা অনেকেই হয়ত শুনে থাকি যে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন দান ধ্যানের ফলে অনেক পুণ্য অর্জন হয়। এর পিছনের পৌরাণিক ব্যাখ্যাটি হয়তো সকলের জানা নেই। 

কথিত আছে যে – “গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরের এক তীব্র দাবদাহে ক্লান্ত হয়ে এক পথিক এক ব্রাহ্মণের গৃহস্থে এসে জল চাইলেন। কিন্তু নির্বোধ ব্রাহ্মনটি তাকে জল তো দিলেনই না, উল্টে অপমান করলেন। 

এমন সময় গৃহের মধ্যে থেকে তাঁর স্ত্রী এসে ব্রাহ্মণকে তাঁর এই নিচ কর্মের জন্য তিরস্কার করলেন ও পথিককে জল দিলেন।

 মৃত্যুর পর যখন সেই ব্রাহ্মণের যমলায়ে বিচার হলো, যমরাজ তাঁকে স্বর্গলাভের আদেশ দেন। বিস্মিত যমদূতরা এমন অধার্মিক ব্যক্তির স্বর্গলাভের কারণ জানতে চাইলেন, প্রত্যুত্তরে যমরাজ তাঁদের জানালেন পত্নীর পুণ্যের ভাগ স্বামী পেয়েছেন।”

পুরানের এই ঘটনাকে অনেকেই বিশ্বাস করেন, আর তাই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন পরিবারের বাকি সদস্যদের পুণ্যের জন্য দান ধ্যান করে থাকেন।

অক্ষয় তৃতীয়ায় কৃষ্ণ মাহাত্ম্য:

  বাল্যবন্ধু শ্রী কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে সুদূর বৃন্দাবন থেকে দ্বারকায় এসেছিলেন সুদামা। অত্যন্ত অভাবে অনটনে থাকা সুদামা শীর্ন ও ক্লান্ত শরীরে তাঁর সখার জন্য পুঁটলিতে তিনমুঠো তন্ডুল বেঁধে এনেছিলেন। 

বন্ধুর এই পরম ভালবাসা শ্রীকৃষ্ণ পরম আদরে গ্রহণ করলেন। সুদামা শত ইচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর করুন কাহিনী শ্রীকৃষ্ণকে বলতে পারলেন না। কিন্তু অন্তর্যামী কৃষ্ণর কোন কিছুই অজানা নয়। 

বৃন্দাবনে ফিরে সুদামা দেখলেন তাঁর পর্নকুটির আর নেই, সেই স্থানে বিশাল প্রাসাদ বিরাজমান আর তাতে রয়েছে তাঁর স্ত্রী বসুন্ধরা ও পুত্রগণ। 

পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিতে শ্রীকৃষ্ণ সুদামার দারিদ্রতা দূর করে তাঁকে প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছিলেন।

অক্ষয় তৃতীয়ায় সোনা ক্রয় করুন ও প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হন:

  অক্ষয় তৃতীয়ার দিন অনেকেই সোনা কেনেন। এদিনই মা লক্ষ্মীর আরাধনা করে অটুট ধন-সম্পত্তির অধিকারী হন ধনের দেবতা কুবের। 

পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে শ্রীকৃষ্ণের কাছে অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য জানতে চাইলেন রাজা যুধিষ্ঠির। এর উত্তরে কৃষ্ণ শুধু একটি বাক্যই প্রয়োগ করলেন-প্রথম পাণ্ডব, জেনে রাখুন এই দিনের মাহাত্ম্য অনন্ত। 

সূর্য ভগবান বনবাসের সময় যুধিষ্ঠিরকে অক্ষয় পাত্র দান করেন। আর এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ করেন কৃষ্ণ। মহাভারতের রচনা শুরু এদিন। মহর্ষি বেদব্যাস বলছেন, গণেশ লিখে চলেছেন। 

একই আধারে কাব্য, পুরাণ ও ইতিহাস হল এই মহাগ্রন্থ। এজন্যই মহাভারত মহাকাব্য। পঞ্চম বেদ হিসেবে স্বীকৃত।

গনেশ ও বেদব্যাসের মহাভারত রচনার কাজ শুরু:

  গণেশ ও মহর্ষি বেদব্যাস মহাভারতের রচনার শুভারম্ভ করেন অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই। 

কথিত আছে যে মহর্ষি বেদব্যাস একদিন গুহায় বসে তপস্যা করছিলেন। সেই ধ্যানমগ্ন হয়েই তিনি মনে মনে মহাভারত রচনা করেছিলেন। 

তিনি চেয়েছিলেন সিদ্ধিদাতা গণেশ তাঁর মহাভারত লিপিবদ্ধ করুন। কিন্তু শর্ত ছিল, গণেশ একবার লেখা শুরু করলে তা রচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেদব্যাস তাঁর আবৃত্তি থামাতে পারবেন না। 

পাল্টা শর্ত হিসাবে বেদব্যাস বলেছিলেন, কোনো শ্লোকের অর্থ না বুঝলে গনেশ তা লিখতে পারবেন না। একে অপরের শর্তে রাজি হওয়ার পর মহাভারত রচনা হওয়া শুরু হয়, যা দীর্ঘ তিন বছর পর সমাপ্ত হয়। 

তাই মনে করা হয়, অক্ষয় তৃতীয়ার মত শুভ দিনে মহাভারত রচনার কাজ শুরু হওয়ায় তা নির্বিঘ্নে শেষ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই যে কোনো শুভ কাজের প্রারম্ভ হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিতেই।

অক্ষয় তৃতীয়ায় দেবী গঙ্গার মর্ত্যে আবির্ভাব:

   গঙ্গার অপর নাম ভাগীরথী তা হয়ত আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই মর্ত্যে কিভাবে গঙ্গা অবতীর্ন হলেন, কেনই বা এলেন তারও ব্যাখ্যা আছে। 

কথিত আছে রাজা ভগীরথ, সাগর রাজার ষাট হাজার ভস্মিভূত পুত্রকে মুক্তি দেওয়ার জন্য গঙ্গাকে মর্ত্যে আসার জন্য অনুরোধ জানান। তাঁরই অনুরোধে গঙ্গা আজকের দিনেই মর্ত্যে অবতীর্ন হয়ে সাগরে মিলিত হন। 

এই বংশেই জন্মগ্রহন করেছিলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র। সেই অর্থে তিনি ভগীরথ রাজার বংশধর। 

আর এই কারনের জন্য সাগরের কাছে গঙ্গার যে শাখা মিলিত হয়েছে তার নাম ভাগীরথী। আর এই অক্ষয় তৃতীয়ার মহা পুণ্য লগ্নে বহু মানুষ গঙ্গা স্নান করেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের শান্তির কামনার্থে।

অক্ষয় তৃতীয়ায় কুবেরের লক্ষী লাভ:

    কথায় বলে ধনকুবের ৷ তাঁর মতো ধনী ব্যক্তি পৃথিবীতে আর দু’টো ছিল না ৷ 

শাস্ত্র মতে কুবের ছিলেন এক অতি সাধারণ মানুষ। শিবের কাছ থেকে বর লাভ করে এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিলেন কুবের ৷ 

এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন, মহাদেব কুবেরকে আশীর্বাদ করেছিলেন দুনিয়ার সব সেরা সম্পদ তিনিই পাবেন ৷ সেই জন্যই এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই অনেকেই ধনকুবেরের মন্ত্র জপ করেন বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়ার জন্য।

বাঙালি সমাজে অক্ষয় তৃতীয়ার গুরুত্ব:

   বছরের শুরুতে পয়লা বৈশাখের দিনটি বাঙালিদের জীবনে অন্যতম এক উৎসবের দিন। সকলেই ওইদিন পুরোনো বছরের সব দুঃখ কষ্ট কাটিয়ে নতুন বছরে নতুনভাবে বছর শুরু করার শুভ কামনা করেন। 

কিন্তু মূলত ব্যবসায়ীরা এই অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ লগ্নে দোকানের হালখাতা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরোনো ধার দেনার হিসাব নিকাশ ও পাওনা গন্ডা মিটিয়ে নেন। কারন হিন্দু শাস্ত্রমতে এইদিন অর্থ লাভ করা শুভ। 

দেবী লক্ষীর কৃপায় ধনকুবের লক্ষী লাভ হয় এই দিনটিতেই। তাই অনেক বাড়ি ও দোকানে লক্ষী ও গণেশের আরাধনা করা হয় এই দিনটিতে। অনেকেই এই শুভ দিনে সোনা ক্রয় করেন।

❤ কলমে – সুস্মিতা দত্ত

Comments: 3

  1. Kabita Sen says:

    Besh valo likhechen, sundor sundor information ache… valo laglo pore… notun blog er opekhai thaklam

  2. Niladri Roy says:

    Useful post indeed, love to share. Keep it up.

  3. Nikita says:

    কিছু আগে জানতাম, কিন্তু এতো সুন্দর ডিটেলস এ জানতাম না। খুব ভালোলাগলো পড়ে।

Comments are closed.