বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য

বাঙলার নববর্ষ: কিছু অজানা তথ্য

    পুরাতনকে আগলে রেখে নতুনকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানো বাঙালির মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য।

আর এভাবেই পুরোনো একটি বছর পার করে নতুন বছরের প্ৰথম দিনটিকে উৎসাহ আর উদ্দীপনার সাথে আমন্ত্রণ জানাতে বাঙালির এই বিশেষ উৎসব – পয়লা বৈশাখ, যা বাংলার নববর্ষের প্রথম দিনটিও বটে।

বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে: Google.com

নববর্ষ বলতে সর্বাগ্রে আমাদের মাথায় আসে ভালো ভুরিভোজ, অতিথিদের বাড়িতে আগমন, নতুন জামা কাপড়, মিষ্টান্ন, হালখাতা আরও অনেক কিছু। 

কিন্তু আজ আমরা দেখে নি এই নববর্ষের পিছনে লুকিয়ে থাকা কিছু অজানা ইতিহাস, তার আবির্ভাব ও স্থান বিশেষে হওয়া কিছু উজ্জাপনের ধরন ধারণ।

বাংলা নববর্ষের আবির্ভাবের ইতিহাস:

   সহস্র প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে বহু রাজা, সম্রাট নানা ধর্ম বর্ণের মানুষ শাসন করেছেন। তাই বাংলার পঞ্জিকা নতুন কিছু নয়।

বাংলা নববর্ষর উদ্ভাবনী তত্ত্ব নিয়ে নানা ঐতিহাসিকের ভিন্ন চিন্তা ভাবনা পরিলক্ষিত হয়। যার মধ্যে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিশেষ কিছু মতবাদকে তুলে ধরা হলো।

দেখতে দেখতে প্রায় ১৪২৬টি বছর বাংলার পঞ্জিকায় পার হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি কি জানেন যে আধুনিক বাংলার এই দিনপঞ্জির আবির্ভাবটি মূলত হয় মোঘল শাসনে- যার মূল স্রষ্টা ছিলেন সম্রাট আকবর

বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে: Google.com

আকবরের সময়কাল ও বঙ্গাব্দের প্রকাশ:

মোঘল শাসনে ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ হিসাবে বাংলার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। 

কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হত। 

খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জীতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। 

সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। 

বাংলা নববর্ষের প্ৰথম মাসটি হলো বৈশাখ,আর এর প্রথম দিনটিকে তাই পহেলা বৈশাখ বলা হত। সেই থেকেই এর নাম পয়লা বৈশাখ, যা আজ বাঙালির জীবনে এক শুভ আনন্দের দিন।

বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে: Google.com

ফতেহউল্লাহ সিরাজি দ্বারা সৃস্ট নতুন সময় পঞ্জির কিছু বৈশিষ্ট্য:

  • ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে।

  •  প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

  • আকবরের সময়কালে প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন।

  •  এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। পরে উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে।

 ঐতিহাসিক শামসুজ্জামান খান ও নীতিশ সেনগুপ্তের মতে বাংলা দিনপঞ্জির উদ্ভব পরিষ্কার নয়।

 শামসুজ্জামান এর মতে, “একে বাংলা সন বা সাল বলা হত, যা যথাক্রমে আরবি ও ফারসি শব্দ। এটা নির্দেশ করছে যে, এটি প্রথম কোন মুসলিম রাজা বা সুলতানের দ্বারা প্রচলিত হয়েছে।”

অন্যদিকে নীতিশ সেনগুপ্তের মতে, এর ঐতিহ্যগত নাম হচ্ছে বঙ্গাব্দ ।

আকবরের শাসনকালের পূর্বেও বঙ্গাব্দের উপস্থিতি

    বঙ্গাব্দ শব্দটি (বাংলা বছর) আকবরের সময়কালের কয়েক শত বছর পূর্বে দুটো শিব মন্দিরেও পাওয়া যায়, যা প্রমান করে বাংলা দিনপঞ্জির অস্তিত্ব আকবরের সময়ের পূর্বেও উপস্থিত ছিল।

আবার এও অস্পষ্ট যে আকবর বা হুসেন শাহ এর দ্বারা এটি গৃহীত হয়েছিল কিনা। বাংলা দিনপঞ্জি ব্যবহারের রীতি আকবরের পূর্বে হুসেন শাহ এর দ্বারাই হয়ে থাকতে পারে।

নীতিশ সেনগুপ্ত বলেন, “বাংলা দিনপঞ্জির প্রচলন যিনিই করে থাকুন না কেন, ঐতিহ্যবাহী বাংলা দিনপঞ্জির উপর ভিত্তি করে বসন্তের ফসল সংগ্রহের পর রাজস্ব আদায়ের জন্য এটা সহায়ক ছিল, কেননা ইসলামী হিজরি সনের ক্ষেত্রে রাজস্ব সংগ্রহের দিন ঠিক করতে প্রসাশনিক জটিলতা তৈরি হত।”

নববর্ষের হিন্দু উদ্ভব তত্ত্ব:

   ঐতিহাসিকদের মতে, পহেলা বৈশাখ উৎসবটি ঐতিহ্যগত হিন্দু নববর্ষ উৎসবের সাথে সম্পর্কিত যা বৈশাখী ও অন্য নামে পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই দিনে এই উৎসব পালিত হয়। হিন্দু ও শিখগণ এই উৎসব পালন করে।

ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নববর্ষের উৎসবগুলো হিন্দু বিক্রমী দিনপঞ্জির সাথে সম্পর্কিত। এই দিনপঞ্জির নামকরণ করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে বিক্রমাদিত্যের নাম অনুসারে।

ভারতের গ্রামীণ বাংলা সম্প্রদায়ে ও নেপালে বিক্রমাদিত্যকে বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাবের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অঞ্চলগুলোর মত বাংলায় বঙ্গাব্দের সূচনা ৫৭ খ্রিস্টপূর্বে হয়নি, বরং ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়েছিল, যা নির্দেশ করছে বঙ্গাব্দের সূচনা প্রমাণ সময়কে কোন একসময় পরিবর্তিত করা হয়েছে। 

মনে করা হয় শশাঙ্কের শাসনকালে এই পরিবর্তন করা হয়। কয়েকজন ঐতিহাসিক বাংলা দিনপঞ্জি উদ্ভবের কৃতিত্ব আরোপ করেন ৭ম শতকের বাংলার শাসক শশাঙ্কের উপর।

বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে: Google.com

নববর্ষের উজ্জাপন:

   অতএব বঙ্গাব্দের উৎপত্তি নিয়ে মতবিরোধ বিস্তর । তার সাথে সাথে আধুনিককালে বাঙালি জনজাতিতে এর উজ্জাপনের রকমভেদও কম কিছু নয়।

আসুন এবার দেখে নেওয়া যাক স্থান কাল পাত্র ভেদে বাঙালির কাছে নববর্ষের উজ্জাপন কেমন?

পশ্চিমবঙ্গের পয়লা বৈশাখ

  পশ্চিমবঙ্গে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উজ্জাপিত হয় বাংলা নববর্ষারম্ভ পয়লা বৈশাখ।

বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে। 

বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
বাংলা নববর্ষের কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে: Google.com

পয়লা বৈশাখ সম্পর্কিত পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি দেখে নেওয়া যাক।

  •  সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুব সংক্রান্তির দিন পালিত হয় গাজন উৎসব উপলক্ষ্যে চড়ক পূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। 

  • এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসী বা ভক্তগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে আরাধ্য দেবতার সন্তোষ প্রদানের চেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকেন।

  • এছাড়া, বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। 

  • পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত। বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন।

  •  ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম হালখাতা । এই উপলক্ষ্যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে মঙ্গলদাত্রী লক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা করা হয়। নতুন খাতায় মঙ্গলচিহ্ন স্বস্তিক আঁকা হয়ে থাকে।

  • পয়লা বৈশাখের দুদিন পূর্বে শিবের বার করা হয় , যা নীলের বার নামে জনপ্রিয়। মা গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে ভোর ভোর গঙ্গায় ডুব দিয়ে শিবের মাথায় জল ঢেলে নতুন বছরের শুভ কামনায় তা উজ্জাপিত হয়।

  • পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার বিখ্যাত কালীঘাট মন্দিরে। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে মন্ত্রপাঠপূর্বক গঙ্গাস্নান সেরে নতুন বছরের শুভারম্ভ করে থাকেন।

বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখ

   এপার বাংলার পাশাপাশি ওপার বাংলাতেও পয়লা বৈশাখ নিয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনা চোখে পড়ার মতো। মূলত এই উৎসবকেই ঘিরে, স্থান বিশেষে এক মাস ব্যাপী চলতে থাকা বৈশাখী মেলার উৎসব পরিলক্ষিত হয়।

  • বর্ষার আগমনির পূর্বেই ইলিশ মাছ সহযোগে পান্তা ভাত খাওয়া পয়লা বৈশাখের ট্রেন্ড বলা যেতে পারে। তার সাথে বিভিন্ন ভাজা ও টক বাংলার বছরের প্রথম দিনটি অন্য আমেজের মাত্রা যোগ করে।

  • এই সময় জনমানসের মনরঞ্জনের উদ্দেশ্যে নৌকা প্রতিযোগিতা, বাইচ, কুস্তি ইত্যাদি আয়োজিত হয়। বাংলাদেশের সবথেকে বড় কুস্তি প্রতিযোগিতা চট্টগ্রামের, লালদিঘি ময়দানের বৈশাখী মেলা উপলক্ষ্যে ১২ই এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়।

  • এছাড়াও, ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা, সোনার গাঁও-যে অনুষ্ঠিত বউমেলা ঘোড়ামেলা পয়লা বৈশাখের উৎসবের মেজাজে অনন্য মাত্রা প্রদান করে।

Written By- Susmita Dutta

Comments: 1

  1. Nikita says:

    বাহ্ ! পুরো ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এতো কিছু জানা ছিলোনা , তথ্য গুলো খুব সুন্দর ভাবে সাজানো। খুব ভালো। আপনার ব্লগ টি এবার থেকে ফলো করবো। 🙂

Comments are closed.