ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

নেড়া-পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

“আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল / পূর্ণিমা তে চাঁদ উঠেছে বলো হরি বোল।।”

বাঙালি মানেই বারো মাসে তেরো পার্বন।আর পার্বন বা উৎসবই মানুষ কে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।

বছরের প্রথমে গ্রীষ্ম এলেও ধীরে বর্ষা আসে তারপর শীতকাল।শীত শেষের রুক্ষতা আসন্ন গ্রীষ্মের ইঙ্গিত দেয় ঠিকই কিন্তু দোলযাত্রা সেই সময়ে এসে মনে খুশির দোলা দিয়ে যায়।

ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি আমাদের তথা বাঙালীদের কাছে দোলযাত্রা বা হোলি নাম পরিচিত।

সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ তো আছেই তার সাথে ভারতবর্ষের বেশ কিছু রাজ্য এই খেলায় মেতে ওঠে। ন্যাড়া পোড়া এবং দোল এর একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে ,

আর শুধু ভারতবর্ষই নয়, তার বাইরেও বেশ কিছু দেশে মানুষ রং এর এই খেলায় অংশগ্রহণ করে।

দিনে দিনে এর মাহাত্ম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দোল মানে বাঙালির মনে যেটা আসে সেটা বিভিন্ন রঙের সুগন্ধী আবির আর তাতে ভালোবাসার ছোঁয়া।

ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে – Google.com

ন্যাড়া পোড়া এবং দোলযাত্রা ও তার প্রস্তুতি পর্ব

দোলযাত্রা একদিনের উৎসব হলেও তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় কিছুদিন আগে থেকেই। নতুন জামাকাপড় আর খাবারদাবারের পাশাপাশি ন্যাড়াপোড়ার আয়োজনও চলতে থাকে।

আমরা সবাই জানি দোলের আগের দিন কিছু কিছু জায়গায় ন্যাড়া পোড়া বা হোলিকা দহন অনুষ্ঠিত হয়।

দোলের ইতিহাস, তাৎপর্য এসব সাধারন তথ্য তো আমরা জানিই, এখন জেনে নি অজানা ইন্টারেষ্টিং কিছু তথ্য।

ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে – Google.com

দোলযাত্রা সূচনা ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা

খ্রীষ্টপূর্বের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে এই খেলার প্রচলন হয়েছিল প্রধানত আরিয়ান জাতির হাত ধরে।  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে এই খেলার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এছাড়াও  হর্ষবর্ধনের রত্নাবলী এবং নারাদপুরান, ভবিষ্যপুরান, বিভিন্ন মন্দির এর ইতিহাস, লিপি, উদ্ধারকৃত পুস্তককে দোলযাত্রার সূচনা বলে মনে করা যেতে পারে।

এই দোলপূর্ণিমা তিথি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি উপলক্ষ্যে উৎসবে একটা নতুন মাত্রা যোগ করে। শোনা যায় শ্রীকৃষ্ণ ফাল্গুনী পূর্ণিমার রাতে তার সখীদের নিয়ে আবির খেলায় মেতেছিলেন।

বাসন্তী পূর্ণিমার এই দিনেই শ্রীকৃষ্ণ এক অত্যাচারী পশু কেশী কে বধ করেছিলেন। এই গল্পগুলি মনে করায় বাঙালির জীবনে দোলের গুরুত্ব।

ন্যাড়া পোড়া কেন হয়? কি বা তার পৌরাণিক ইতিহাস?

ন্যাড়াপোড়া এর কাহিনী তো কমবেশি আমাদের সকলেরই জানা।

মহাবলী ও ক্রূর রাজা হিরণ্যকাশ্যপ এর একমাত্র পুত্র প্রহ্লাদ যে কিনা ছিল এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা ভগবান শ্রী বিষ্ণুর পরমভক্ত।

অসুর বংশে জন্মে এবং অসুর রাজের পুত্র হয়ে কিভাবে প্রহ্লাদ সারাদিন বিষ্ণু ধ্যানে মগ্ন থাকে , সেটি ই ছিল অসুর রাজের ক্রোধ এর মূল কারণ।

অনেক চেষ্টা করেও যখন প্রহ্লাদ এর মন থেকে শ্রী বিষ্ণুর নাম মুছতে পারলোনা , তখন হিরণ্যকাশ্যপ সিদ্ধান্ত নিলো, নিজের ছেলেকে বধ করার।

তাই ষড়যন্ত্র করে নিজের বোন হোলিকা কে স্মরণ করলো, প্রহ্লাদ কে হত্যা করার জন্য।

অসুর কন্যা ও হিরন্যাকাশপ এর বোন হোলিকার এক অদ্ভুদ ক্ষমতা ছিল। স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু তাকে বর দিয়েছিলেন, যে, কোনো অগ্নি হোলিকা কে স্পর্শ করতে বা জ্বালাতে পারবেনা।

এই ক্ষমতার অপব্যাবহার করে সে এবং অসুর রাজ, প্রহ্লাদকে হত্যা করতে চেয়েছিলো।

কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় ও তার ভক্তির জোড়ে ছোট্ট প্রল্হাদ বেচেঁ যায়। আর হোলিকা জ্বলন্ত অগ্নি চিতায় দ্বগ্ধ হয়ে মারা যায়।

এই কাহিনী একদিকে অশুভ শক্তির পরাজয় আর অন্যদিকে শুভশক্তির জয়লাভের কাহিনী শোনায়।তাই ন্যাড়া পোড়া কে হোলিকা দহন ও বলা হয়ে থাকে।

ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে – Google.com

হোলিকা দহন এর আর এক প্রচলিত কাহিনী

হোলিকা দহন নিয়ে আরেকটা কাহিনীও খুব প্রচলিত। অনেকে একে চাঁচর ও বলে থাকেন।

বসন্ত শেষের হোলি কে বর্ষ শেষ অনুষ্ঠান বলা যেতেই পারে। বসন্তের সময় গাছের পাতা ঝরে যায়, তাই এই গাছের পুরোনো ডাল পালা, পাতা একত্রিত করে তাতে আগুন জ্বালানো হয়।

এর সামাজিক তাৎপর্য হিসাবে বলা হয়, পুরোনো জঞ্জাল, রুক্ষতা শুস্কতা কে সরিয়ে আবার নতুন বছর শুরুর আহ্বান করা।

এই হোলিকা দহন এর পরে অনেকেই চন্দন মিশ্রিত ছাই কপালে পরেন। অনেক জায়গায় আমের মুকুল বা মঞ্জরীও কেউ কেউ জল দিয়ে গ্রহণ করেন।

বলা হয় তা সংক্রামক বিরোধী হিসাবে কাজ করে।    

পশ্চিমবঙ্গের দোলযাত্রা ও রবি ঠাকুর এর অবদান

পশ্চিমবঙ্গে দোলযাত্রা উৎসব বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর হাত ধরেই প্রচলিত হয়।

বীরভূমের  শান্তিনিকেতন এই দিন সুন্দর করে সেজে ওঠে ফুল আর আবির দিয়ে। এই উৎসব ‘বসন্ত উৎসব’ নামেও পরিচিত।

১৯০১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বসন্তকালের মরসুমে ছোট ছোট মেয়েরা শাড়ি পরে দলে দলে ভাগ হয়ে অনুষ্ঠান করতো।

সকাল থেকে রাত অব্দি অনেক রকম নৃত্য গীতের মধ্যে দিয়ে আবির খেলা চলতো।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজনে একসময় প্রধান দায়িত্ব পালন করতেন, আমবাগান সেজে উঠতো তাঁরই নেতৃত্বে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও স্বয়ং এই অনুষ্ঠানে যোগদান করতেন।তাঁর পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করে ছোট ছোট মেয়েরা আশীর্বাদ নিতো।

এভাবেই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হতো।

বসন্ত উৎসব এবং বাঙালি

১৯৩২ সাল থেকে এই অনুষ্ঠান বসন্ত উৎসব নাম পরিচিত হওয়ার পরে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

বর্তমানে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এই ফাল্গুনী পূর্ণিমা কে স্মরণীয় করতে এই অনুষ্ঠানে সামিল হন।

হলুদ শাড়ি আর গাদা ফুল এর মালায় মেয়েরা সুন্দর করে সাজে।তাদের গলায় ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল ‘ সংগীত দিয়ে মূল প্রোগ্রাম শুরু হয়।

সকাল থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়,এক অদ্ভুত বাতাবরণ তৈরী হয়। সন্ধ্যেতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কোনো নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।

ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে – Google.com

অন্য রাজ্যের দোলযাত্রার তাৎপর্য

এর পরে আসি উত্তরপ্রদেশের দোলযাত্রার সূচনা কিভাবে হয়।এখানে এই উৎসব ‘লাঠমার হোলি’ নাম অধিক পরিচিত।

বৃন্দাবন, মথুরা, নান্দিগাঁও ও বারসেনা প্রদেশ হোলি খেলার জন্যে বেশ প্রসিদ্ধ।

এখানে এই দিন রং খেলার পাশাপাশি  লাঠিখেলার প্রচলন ও আছে। যাতে নারী ও পুরুষ এক সাথে আনন্দ উপভোগ  করেন।

কবির কণ্ঠে গেয়ে উঠি –

“ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে / ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে”

লাঠমার কী এবং কিভাবে খেলা হয়?

মেয়েরা শ্রীকৃষ্ণের গোপিনীদের মতো পোশাক পরে লাঠি নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

পুরুষরাও তাদের সাথে মানানসই পোশাক পড়েন  এবং লাঠির হাত থেকে ঢালের সাহায্যে নিজেদের রক্ষা করেন। সকলেই এই মজাদার ও চিত্রকর্সক প্রথায় সামিল হন।

মন্দিরে পুজো দিয়ে এই খেলা শুরু হয়। বারাণসী তে কাদা মেখে কুস্তির মাধ্যমে সবাই আনন্দ করেন। কানপুর এ গঙ্গার ধার ঘেঁষে এই খেলা ‘জাতীয়তাবাদী গঙ্গা মেলা’ হিসাবে উৎযাপিত হয়। 

ফাগুয়া কিভাবে খেলা হয়  

এর পর আসি বিহারের ‘ফাগুয়ার’ কথায়, হ্যা ঠিকই ভাবছেন বিহারে হোলি ‘ফাগুয়া‘ নামেই পরিচিত। যেটি একটা ভোজপুরি ভাষা।

খুবই জনপ্রিয় এই খেলা হোলিকা দহন এর মধ্যে দিয়ে শুরু হলেও দ্বিতীয় দিন বিভিন্ন রকম খাওয়া দাওয়া , ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গান ও  তার সাথে নাচ  এক অভিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

এছাড়া আবির, রং, মুখোশ তো চলেই এমন কি কাদা, গোবরও বাদ যায়  না।

আর আছে ভাং মিশ্রিত মশলা দেওয়া দুধের শরবত যা ঠান্ডাই নামেও পরিচিত। যা উপভোগ করার জন্য বিহার এ সারাবছর মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন।

ইয়াওসং এর তাৎপর্য

এর পর আসি মনিপুর এর কথায়।

এখানে এই উৎসব ইয়াওসং নামেই  সবাই বলে থাকেন। ছোট কাঠের ঘর বানিয়ে সেখানে শ্রীচৈতন্যের জন্মদিন পালন করা হয় ও অত্যন্ত নিষ্ঠা ভরে পুজোও করা হয়।

‘থাবল চুম্বা’ নামে প্রাদেশিক নৃত্য এই অনুষ্ঠানের এক বিশেষ অঙ্গ, তারপর শুরু হয় রং এর খেলা।

দোল এর দিন থেকে ৬ -৭ দিন ধরে এই উৎসব চলে।  দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন এই আদর্শেই এই পূজা এবং ইয়াওসং খেলা চলে আসছে।

বাকি রাজ্যগুলোও কিভাবে এই উৎসবে পা মেলান

মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশে এই  খেলা ‘রংপঞ্চমী’ নামে প্রচলিত। ছেলেরা গোল করে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজন এর ওপর উঠতে থাকে যা পিরামিড এর আকৃতি নেয়।

যে সব থেকে উপরে উঠতে পারবে সেই দই এর হাড়ি ভাঙতে পারবে।

সিনেমা সিরিয়াল গুলোতে রংপঞ্চম্মীর এই ছবি আমরা অনেকবার দেখেছি তবে আশ্চর্য আরেকটা কথা হলো হোলিকা দহনের প্রায় ৫ দিন পর রং খেলার চল এখানে চলে আসছে।

আসামে দোল উৎসব ‘ফাওয়াহ’ নাম পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রথম দিন হোলিকা দহন এবং দ্বিতীয় দিন আবির ও রং সহযোগে মানুষ খেলায় মেতে ওঠেন।

গোয়াতে এই খেলা ‘সিগমো’  নামে পরিচিত।হিন্দুরা এই খেলায় মেতে ওঠেন।অন্যতম প্রধান এই খেলায় চাষীরা দলবদ্ধ ভাবে রাস্তায় আঞ্চলিক নৃত্য পরিবেশন করেন।

বিদেশ থেকেও প্রচুর মানুষ আসেন এবং খেলায় অংশ গ্রহণ করেন। 

তবে উত্তরের মতো দক্ষিণের রাজ্য গুলোয় এই খেলা অতটা প্রচলিত নয়। নিজ নিজ আঞ্চলিক নামে হোলি তে মানুষ এই সব রাজ্যে মেতে ওঠেন। 

ন্যাড়া পোড়া, এবং দোল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
সৌজন্যে – Google.com

উৎসব কোনো পালন করি

ভারতবর্ষের বাইরেও এই খেলা বর্তমানে প্রচলিত হয় উঠছে। আসলে উৎসবের ভাগ হয় না।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে উৎসবে যোগদান করাই আসল কথা। কোনো অনুষ্ঠানে সামিল হওয়াই মানুষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

কোনো উৎসবই ছোট নয়। আর যেখানে রঙের খেলা সেখানে মানুষের ভেদাভেদ কিসের?

বয়স এর তোয়াক্কা না করে সবাই মিলে এগিয়ে এসে এই উৎসব কে আরো শোভা মন্ডিত করে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য।

বিশ্বকবির কথায় ‘আজ সবার  রঙে রং মিশাতে হবে’ চলুন আমরাও একই পথের কান্ডারি হই।

সবাই কে দোলযাত্রার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।  

ByDCW Staff